নিজস্ব প্রতিবেদক
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে শুরু হয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। যুদ্ধ ও শান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, টেকসই উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসহ বর্তমান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় এবারের অধিবেশনের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
জাতিসংঘের সূচি অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাধারণ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর আবারও সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের খলিলুর রহমান। এবারের অধিবেশনের মূল ভাবনায় রয়েছে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন, বৈশ্বিক পরিবর্তনকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা এবং সবার জন্য আরও কার্যকর জাতিসংঘ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বর্তমান বিশ্বের সামনে থাকা কয়েকটি বড় সংকটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যুদ্ধ ও সংঘাত, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশকে তিনি ভবিষ্যৎ বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা বিভাজন ও অবিশ্বাস কাটিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
২৩ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং ন্যায্য রূপান্তর নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক রয়েছে। সেখানে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদক ও ব্যবহারকারী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির এক দশক পর বিশ্ব জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করার বিষয়টি এবারের বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
একই দিনে উন্নয়নের অধিকার নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উন্নয়নের অধিকার সম্পর্কিত ঘোষণার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই বৈঠকে মানুষের মর্যাদা, সমতা, ন্যায়বিচার এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়গুলো সামনে আসছে। ১৯৮৬ সালে গৃহীত ওই ঘোষণার চার দশক পর বর্তমান বিশ্বে এর বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
এদিকে বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে অন্যতম প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, মানবিক সংকট এবং সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে বিশ্ব নেতারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন।
২২ সেপ্টেম্বরের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান প্রসঙ্গে তাঁর সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসানে একটি সমঝোতার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি চুক্তি না হলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সতর্কতাও দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও এবারের সাধারণ পরিষদের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। গাজা পরিস্থিতি, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, মানবিক সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন দেশের নেতারা বক্তব্য দিচ্ছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাতে সিঙ্গাপুরের স্ট্রেইটস টাইমস জানিয়েছে, জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গাজা পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। এতে মধ্যপ্রাচ্য সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের অবস্থানের পার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। জাতিসংঘের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র এবং নিচু উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি তৈরি করছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, জলবায়ু অভিযোজন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো বৈঠকে গুরুত্ব পাবে।
কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতার পর ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিও এবারের অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। ২৫ সেপ্টেম্বর মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও মোকাবিলা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন কোনো মহামারি দেখা দিলে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে সেখানে আলোচনা হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশও জাতিসংঘের এবারের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, ব্যবসা ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে AI নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও ভুল তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তাই AI-এর সুবিধা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর নীতিমালা ও সহযোগিতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের জন্যও এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বিশ্বের বিভিন্ন সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তাঁর সভাপতিত্বে। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই পর্বে বাংলাদেশের ভূমিকা বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মহামারি প্রস্তুতি, মানবাধিকার, বৈষম্য, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। জাতিসংঘের সূচি অনুযায়ী, ২৮ সেপ্টেম্বর বর্ণবাদবিরোধী ডারবান ঘোষণা ও কর্মসূচির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং ২৯ সেপ্টেম্বর পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ বিলোপের আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে বিশ্বের একাধিক সংকট একই সঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। যুদ্ধ ও সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, উন্নয়ন, মহামারি প্রস্তুতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলোতে সমাধান খুঁজতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।
বিশ্বনেতাদের বক্তব্য, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে যেসব সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ সামনে আসবে, সেগুলো ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলবে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে