নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ঘিরে অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। অপসারিত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি তৃতীয় দিনেও অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রধান ফটকে তালা দিয়ে সেখানে অবস্থান করছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
বুধবার সকাল ৯টার দিকে শিক্ষার্থীরা চুয়েটের মূল ফটক বন্ধ করে দেন। ফটকের সামনে টায়ার ও বেঞ্চ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তারা বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শাটডাউনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের যানবাহন প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসাসেবাকে কর্মসূচির বাইরে রাখা হয়েছে।
ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, প্রশাসনিক ভবন, উপাচার্য ভবনসহ বিভিন্ন একাডেমিক ভবনের প্রবেশপথ বন্ধ রয়েছে। ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাবরেটরি ও ওয়ার্কশপের কার্যক্রমও চলছে না। ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে উপস্থিত না থাকায় নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়নি।
এর মধ্যে বুধবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারহান হাসনাত আদিব বলেন, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে তা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে পাঠানো হবে। যৌক্তিক কারণ ছাড়া উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবেন না বলেও জানান তিনি।
চুয়েটের উপাচার্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করেই মূলত এই আন্দোলনের সূত্রপাত। গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই প্রজ্ঞাপনে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি গত ২৭ জুলাই ২০২৬ উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ৫৬ দিনের মধ্যেই তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই অল্প সময়ের মধ্যে উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের কাছে কোনো সুস্পষ্ট কারণ জানানো হয়নি। তাদের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাপক সায়েম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়, আবাসিক হলের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান এবং একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার মতো উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এসব কারণে তিনি শিক্ষার্থীদের একটি অংশের আস্থা অর্জন করেছিলেন বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, তারা নতুন উপাচার্য নিয়োগের বিরোধিতা করছেন না; বরং অল্প সময়ের মধ্যে বর্তমান উপাচার্যকে পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাদের দাবি, অধ্যাপক সায়েমকে কাজ করার জন্য আরও সময় দেওয়া উচিত ছিল। সে কারণেই তাকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
উপাচার্য পরিবর্তনের খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ার পর গত ২১ সেপ্টেম্বর রাত থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিক্ষোভ শুরু হয়। ওই রাতে স্বাধীনতা চত্বর থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল বের করেন। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল ও শিক্ষক আবাসিক এলাকা প্রদক্ষিণ করে উপাচার্য ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
পরে উপাচার্য ভবন ও প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। এর পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে প্রধান ফটকে তালা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন তারা।
আন্দোলনের সঙ্গে চুয়েট শিক্ষক সমিতিও সংহতি জানিয়েছে। শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকেও অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল এবং উপাচার্য নিয়োগ ও অব্যাহতি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। শিক্ষকরা মনে করছেন, মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিবর্তন হলে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশও শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন বলে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন। ফলে বিষয়টি এখন শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অংশের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের থিসিস, প্রজেক্ট, ল্যাব ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শাটডাউন দীর্ঘ হলে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার সময়সূচিও প্রভাবিত হতে পারে বলে অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন।
চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, তারা দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস বন্ধ রাখতে চান না এবং নিয়মিত ক্লাসে ফিরতে চান। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিতিশীল পরিবেশ ও শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি উপাচার্য পরিবর্তনের বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান তারা।
এদিকে, প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। নতুন নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমও এখনো চুয়েট ক্যাম্পাসে যোগদান করেননি বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থা দূর করে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হলে পরিস্থিতির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের হতে পারে।
তবে আন্দোলনকারীরা তাদের অবস্থানে এখনো অনড়। অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত কমপ্লিট শাটডাউন, গণঅবস্থান ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
চুয়েটের চলমান পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে আছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।