নিজস্ব প্রতিবেদক
টানা কয়েক সপ্তাহ দাম বাড়ার পর অবশেষে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে দেশের মাছ ও মুরগির বাজারে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে কয়েক ধরনের মাছ ও মুরগির দাম কমতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও কেজিতে ২০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত কমেছে দাম। তবে মাছ ও মুরগির বাজারে স্বস্তি ফিরলেও ডিমের বাজারে এখনো স্বস্তি নেই। সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মধ্যে ডিমের দাম তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিছুদিন আগেও প্রতি কেজি ব্রয়লার ২১০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে সোনালি মুরগির দামও কমেছে। আগে যেখানে প্রতি কেজি ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হতো, এখন সেটি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০ টাকায়। লেয়ার মুরগির দামও কিছুটা কমে বর্তমানে কেজিপ্রতি প্রায় ২৬০ টাকার আশপাশে রয়েছে।
বিক্রেতা ও খামারিদের মতে, বাজারে সরবরাহ বাড়ার কারণে মুরগির দাম কমেছে। একই সঙ্গে মুরগির বাচ্চা ও খাদ্যের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় উৎপাদন ব্যয়ের চাপও কিছুটা কমেছে। ফলে আগের তুলনায় কম দামে মুরগি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে।
মুরগির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মাছের দামও কমেছে। বাজারে সরবরাহ বাড়ায় চাষের মাছসহ কয়েক ধরনের দেশি মাছের দাম আগের তুলনায় কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে চাষের রুই মাছ প্রতি কেজি প্রায় ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত মাসে একই মাছের দাম ছিল প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা। কাতল মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকার মধ্যে। তেলাপিয়ার দামও কমে কেজিপ্রতি প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় নেমেছে। পাঙ্গাস মাছ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৬০ টাকায়, যা কিছুদিন আগেও ১৯০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ছিল।
চিংড়ির বাজারেও তুলনামূলক স্বস্তি দেখা গেছে। মাঝারি আকারের বাগদা চিংড়ির দাম কেজিতে প্রায় ৮০০ টাকা থেকে কমে এখন ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। মৎস্য ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন হাওর, পুকুর ও জলাশয় থেকে নতুন মাছ বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও।
তবে মাছ ও মুরগির দাম কমলেও ডিমের বাজারে এখনো উল্টো চিত্র। বর্তমানে বিভিন্ন বাজারে ফার্মের ডিম প্রতি ডজন ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছু বাজারে দাম আরও বেশি নিয়ে ১৭৫ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। এ হিসাবে একটি ডিমের দাম পড়ছে প্রায় ১৪ টাকা বা তারও বেশি। অথচ গত মাসে প্রতি ডজন ডিমের দাম ছিল প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা।
হালি হিসেবে কিনলেও ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। দেশি মুরগি ও হাঁসের ডিমের দাম আরও বেশি। দেশি মুরগির ডিম প্রতি ডজন প্রায় ২২০ টাকা এবং হাঁসের ডিম প্রায় ২১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ডিমের বাড়তি দামে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। অনেক পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় ডিম থাকলেও দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিম কিনতে পারছেন না। ক্রেতাদের অভিযোগ, মুরগির দাম কমলেও ডিমের দাম একইভাবে না কমার বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও নজরদারির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বলছে, অতিরিক্ত গরমের কারণে মুরগির ডিম উৎপাদন কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি মুরগির খাদ্যের দাম এখনো তুলনামূলক বেশি। এসব কারণে উৎপাদন ব্যয় কমানো যাচ্ছে না বলে দাবি তাদের। তাদের মতে, একটি মুরগি থেকে ডিম উৎপাদনে খাদ্য, পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়। ফলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বাজারে ডিমের দাম নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
তবে বাজার সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, ডিমের বাজারে সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি আরও স্বচ্ছভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের পার্থক্যও নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার।
ভোক্তাদের মতে, মাছ ও মুরগির দাম কমার পর বাজারে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হলেও ডিমের বাড়তি দাম সেই স্বস্তিকে অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য ডিম দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক সহজলভ্য প্রাণিজ আমিষের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তাই ডিমের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ খুঁজে বের করার পাশাপাশি উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের দাবি উঠেছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত বাজার তদারকি আরও জোরদার করা হলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। মাছ ও মুরগির দাম যেভাবে কমেছে, একইভাবে ডিমের বাজারেও দ্রুত দাম কমবে—এমন প্রত্যাশা করছেন সাধারণ ক্রেতারা। তবে ডিমের দাম কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন, সরবরাহ, খাদ্যের দাম এবং বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, বাজারে নজরদারি বাড়িয়ে অস্বাভাবিক দাম নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রাণিজ আমিষ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা হবে। মাছ ও মুরগির বাজারে সাম্প্রতিক দরপতন ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করলেও ডিমের দাম কমলেই সেই স্বস্তি আরও পূর্ণতা পাবে বলে মনে করছেন ভোক্তারা।