নিজস্ব প্রতিবেদক
অস্ট্রেলিয়ার কৃষি খাতে শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিকাজ, ফল ও সবজি সংগ্রহ, বাগান পরিচর্যা এবং মৌসুমি উৎপাদন কার্যক্রমে নির্দিষ্ট সময়ে অতিরিক্ত কর্মীর প্রয়োজন হয়। এ কারণে কৃষি খাতে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়া সরকার বিভিন্ন ভিসা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে। এরই মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু দক্ষ কর্মী এবং কৃষি-সংশ্লিষ্ট পেশার ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার কৃষি খাতে বিদেশি কর্মীদের কাজের সুযোগ রয়েছে—এটি সত্য। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিওতে বাংলাদেশিদের জন্য সরাসরি কৃষি শ্রমিক নিয়োগের যে দাবি করা হচ্ছে, তার সবটুকু সরকারি তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে ‘বাংলাদেশ থেকে সরাসরি হাজার হাজার কৃষি শ্রমিক নিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া’—এ ধরনের দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট ভিসা কর্মসূচি, যোগ্যতা, নিয়োগকর্তা এবং কোন দেশের নাগরিকরা ওই কর্মসূচির আওতায় পড়ছেন, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ায় কৃষি খাতে কাজের ধরন অনেক বিস্তৃত। ফল সংগ্রহ, ফসল তোলা, প্যাকিং, বাগান পরিচর্যা, কৃষি উৎপাদন, পশুপালনসহ বিভিন্ন ধরনের কাজে কর্মীর প্রয়োজন হয়। মৌসুমি সময় অনুযায়ী এসব কাজের চাহিদাও বাড়তে বা কমতে পারে। দেশটির সরকারি Workforce Australia প্ল্যাটফর্মেও কৃষি ও হারভেস্ট-সংক্রান্ত বিভিন্ন চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ফলে কৃষি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ যে রয়েছে, সেটি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
তবে কৃষি খাতে চাকরি পাওয়া এবং নির্দিষ্ট কোনো কৃষি শ্রমিক ভিসা কর্মসূচির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করা এক বিষয় নয়। একজন বিদেশি নাগরিককে অস্ট্রেলিয়ায় কাজের জন্য যেতে হলে তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ভিসার শর্ত পূরণ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হতে পারে নির্দিষ্ট দক্ষতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, অনুমোদিত নিয়োগকর্তার চাকরির প্রস্তাব এবং অন্যান্য সরকারি শর্ত।
সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে অস্ট্রেলিয়ার নির্দিষ্ট দক্ষ ভিসার আবেদন প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার ব্যবস্থার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, জলজ চাষ, মৎস্য এবং সম্পদ খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু আবেদন অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। Skills in Demand বা সাবক্লাস ৪৮২-এর মতো নির্দিষ্ট দক্ষ ভিসার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পেশা ও অন্যান্য শর্তের ভিত্তিতে এই অগ্রাধিকার প্রযোজ্য হতে পারে।
কিন্তু ভিসা আবেদনে কোনো খাত অগ্রাধিকার পাওয়া মানেই ওই খাতের যেকোনো কাজের জন্য বিশ্বের সব দেশের নাগরিক সরাসরি আবেদন করতে পারবেন—এমন নয়। আবেদনকারীর যোগ্যতা, পেশা, নিয়োগকর্তা, ভিসার ধরন এবং সংশ্লিষ্ট অভিবাসন নীতিমালা বিবেচনা করা হয়। তাই কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—এই তথ্যকে সরাসরি ‘বাংলাদেশ থেকে কৃষি শ্রমিক নেওয়া হচ্ছে’ হিসেবে প্রচার করা সঠিক হবে না।
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়ার Pacific Australia Labour Mobility বা PALM কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ এবং তিমুর-লেস্তের নাগরিকদের অস্ট্রেলিয়ায় নির্দিষ্ট ধরনের শ্রমিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে সরকারি তালিকায় ফিজি, কিরিবাতি, নাউরু, পাপুয়া নিউগিনি, সামোয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, তিমুর-লেস্তে, টোঙ্গা, টুভালু ও ভানুয়াতু রয়েছে। বাংলাদেশ এই কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী দেশের তালিকায় নেই।
এ কারণে PALM কর্মসূচির তথ্য ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কৃষি শ্রমিক নিয়োগের দাবি করা হলে সেটি বিভ্রান্তিকর হতে পারে। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় কৃষি খাতে কাজের সম্ভাবনা একেবারে নেই—এমনটিও বলা যাবে না। বরং কোন চাকরি ও কোন ভিসা ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন বাংলাদেশি নাগরিক বৈধভাবে অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করতে পারবেন, সেটিই মূল বিষয়।
অস্ট্রেলিয়ার কৃষি খাতে শ্রমিকের চাহিদা তৈরি হওয়ার পেছনে মৌসুমি উৎপাদন ব্যবস্থা বড় একটি কারণ। ফল ও সবজি সংগ্রহের মৌসুমে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে। অনেক কৃষি এলাকায় স্থানীয় শ্রমিকের পাশাপাশি বিদেশি কর্মীদের ওপরও নির্ভরতা রয়েছে। বিশেষ করে হারভেস্টের সময় শ্রমিক সংকট দেখা দিলে কৃষকদের উৎপাদন ও সময়মতো ফসল সংগ্রহ নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়।
সাম্প্রতিক সময়েও দেশটির কৃষি খাতে শ্রমিক সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ অস্ট্রেলিয়ার ABC News-এর প্রতিবেদনে কৃষকদের শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় ফার্মের কাজের জন্য কিছু Working Holiday ভিসা আবেদন দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে সরকার ও National Farmers' Federation-এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি সমঝোতার কথা উঠে আসে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় শ্রমিক নিশ্চিত করা অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে এই ধরনের Working Holiday ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশিদের জন্য সরাসরি কৃষি শ্রমিক নিয়োগ—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। কারণ প্রত্যেক ভিসার নিজস্ব যোগ্যতা ও নিয়ম রয়েছে। কোনো একটি দেশের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য সুযোগ অন্য দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয় না।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার কৃষি খাতে কাজের সুযোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার আশঙ্কাও বাড়তে পারে। বিভিন্ন সময় বিদেশে চাকরির নামে ভুয়া নিয়োগপত্র, ভুয়া ভিসা এবং অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে কেউ যদি বাংলাদেশি নাগরিকদের অস্ট্রেলিয়ার কৃষি খাতে নিশ্চিত চাকরি, দ্রুত ভিসা বা সরাসরি নিয়োগের কথা বলে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করে, তাহলে অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ার ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াও সরকারি নিয়মের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়। বাংলাদেশে থাকা আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভিসার আবেদন অনলাইনে ImmiAccount-এর মাধ্যমে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই কোনো দালাল বা অননুমোদিত ব্যক্তির কথায় নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট ভিসার সরকারি তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো বাংলাদেশি নাগরিক অস্ট্রেলিয়ায় কৃষি খাতে কাজ করতে চাইলে প্রথমেই তাকে দেখতে হবে যে তার জন্য কোন ধরনের ভিসা প্রযোজ্য। এরপর সংশ্লিষ্ট চাকরিটি বৈধ কি না, নিয়োগকর্তা অনুমোদিত কি না, চাকরির প্রস্তাব বাস্তব কি না এবং ভিসার সব যোগ্যতা পূরণ হচ্ছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করতে হবে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন বা ভিডিও দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
অস্ট্রেলিয়ার কৃষি খাতে ভবিষ্যতে শ্রমিকের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। উৎপাদন, ফল সংগ্রহ এবং মৌসুমি কৃষিকাজে কর্মীর প্রয়োজন থাকায় বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ থেকে নির্দিষ্ট কোনো সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যাপকসংখ্যক কৃষি শ্রমিক নেওয়া হচ্ছে—এমন ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এ ধরনের খবরকে নিশ্চিত সরকারি নিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার কৃষি খাতে শ্রমিকের চাহিদা বাস্তব এবং দেশটির বিভিন্ন কৃষি ও মৌসুমি কাজে কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। নির্দিষ্ট দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কিছু ভিসা আবেদনে কৃষি খাত অগ্রাধিকারও পেতে পারে। কিন্তু এর অর্থ বাংলাদেশ থেকে সরাসরি সাধারণ কৃষি শ্রমিক নেওয়ার কোনো নতুন কর্মসূচি চালু হয়েছে—এমন নয়।
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক তথ্য যাচাই করে বৈধ পথে আবেদন করা। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওয়েবসাইট, সংশ্লিষ্ট ভিসার শর্ত এবং অনুমোদিত নিয়োগকর্তার তথ্য যাচাই না করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে ‘ভিসা নিশ্চিত’, ‘কোনো যোগ্যতা লাগবে না’, ‘সরাসরি ফার্মে চাকরি’ বা ‘অল্প টাকায় অস্ট্রেলিয়া যাওয়া যাবে’—এ ধরনের প্রচারণা দেখলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
তাই অস্ট্রেলিয়ার কৃষি খাতে শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে—এটি সত্য হলেও বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ব্যাপকসংখ্যক কৃষি শ্রমিক নেওয়ার খবরকে সরকারি ঘোষণা হিসেবে প্রচার করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা জরুরি। সঠিক ভিসা, বৈধ নিয়োগ এবং সরকারি নিয়ম মেনে আবেদন করলেই বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।