ক্রীড়া প্রতিবেদক
FIFA ASEAN Cup 2026-এর গ্রুপ পর্বে আজ সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঠে নামছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার ঐতিহাসিক গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় শুরু হবে ম্যাচটি। দুই দলই টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে হারের মুখ দেখায় আজকের লড়াই তাদের জন্য বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে।
টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হেরে শুরুটা ভালো হয়নি বাংলাদেশের। ওই ম্যাচে রক্ষণভাগের দুর্বলতা, বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারা এবং প্রতিপক্ষকে একের পর এক আক্রমণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবার সেই ভুলগুলো কাটিয়ে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের প্রধান কোচ থমাস ডুলি জানিয়েছেন, আগের ম্যাচের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দলকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে হবে। বিশেষ করে বল দখলের লড়াইয়ে সক্রিয় থাকা এবং প্রতিপক্ষের ওপর শুরু থেকেই চাপ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। কোচের লক্ষ্যও পরিষ্কার—সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে পূর্ণ তিন পয়েন্ট অর্জন করা।
২৫ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে শুরু থেকেই চাপে ছিল বাংলাদেশ। মালয়েশিয়ার আক্রমণের সামনে কাঙ্ক্ষিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি লাল-সবুজের দল। প্রথমার্ধেই আরিফ আইমান দুটি গোল করে মালয়েশিয়াকে এগিয়ে দেন। দ্বিতীয়ার্ধে বার্গসনের গোলে ব্যবধান আরও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ৩-০ গোলের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।
প্রথম ম্যাচের এই ফল গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের সমীকরণ কঠিন করে দিয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে পয়েন্ট না পেলে পরের ধাপে যাওয়ার সম্ভাবনা আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে। একই কারণে আজকের ম্যাচে জয় বা অন্তত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আদায় করতে মরিয়া থাকবে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুরও নিজেদের প্রথম ম্যাচে হেরেছে। স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে পরাজিত হয়েছে তারা। ফলে বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখছে সিঙ্গাপুরও। দলটির প্রধান কোচ গ্যাভিন লি প্রথম ম্যাচের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির একটি দিক হতে পারে সিঙ্গাপুরের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় সাফুয়ান বাহারুদ্দিনের অনুপস্থিতি। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে লাল কার্ড দেখায় বাংলাদেশের বিপক্ষে মাঠে নামতে পারবেন না তিনি। ফলে সিঙ্গাপুরের একাদশে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন আসতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যানও বাংলাদেশের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫ সালের এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে দুই দলের দুই ম্যাচেই জয় পেয়েছিল সিঙ্গাপুর। ঢাকার ম্যাচে তারা ২-১ গোলে বাংলাদেশকে হারায়। পরের ম্যাচে নিজেদের মাঠে ১-০ গোলের জয় পায় সিঙ্গাপুর।
তবে আগের ফলাফলকে সামনে রেখে মাঠে নামতে চাইছে না বাংলাদেশ। বরং অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার ভিন্ন ফল পাওয়ার লক্ষ্য দলের। মিডফিল্ডার শামিত শোমের বক্তব্যেও সেই আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত রয়েছে। সিঙ্গাপুরকে সমীহ করলেও তাদের বিপক্ষে ভালো মুহূর্ত তৈরি করার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে এবং সেটিই এবার কাজে লাগাতে চায় দল।
বাংলাদেশের মাঝমাঠে বড় দায়িত্ব পালন করতে পারেন হ্যামজা চৌধুরী। ইংলিশ ফুটবলে খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই মিডফিল্ডার মালয়েশিয়ার বিপক্ষেও আলোচনায় ছিলেন। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামানোর পাশাপাশি দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার ক্ষেত্রেও হ্যামজার ওপর থাকবে বাড়তি দায়িত্ব।
সিঙ্গাপুরের কিয়োগো নাকামুরার সঙ্গে হ্যামজা চৌধুরীর মাঝমাঠের লড়াই ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ যদি মাঝমাঠে বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তাহলে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের কাছে নিয়মিত বল পৌঁছানোর সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে রক্ষণ থেকে আক্রমণে দ্রুত ওঠার পথও সহজ হবে।
মালয়েশিয়ার বিপক্ষে তিন গোল হজম করার পর বাংলাদেশের রক্ষণভাগে কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে। কোচ থমাস ডুলি দলকে আরও সংগঠিত করার পাশাপাশি রক্ষণে ভুল কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। জিদান ইউসুফকে রক্ষণভাগের মাঝখানে খেলানোর পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে বাংলাদেশের সাফল্যের জন্য শুরু থেকেই মনোযোগ ধরে রাখা জরুরি। মালয়েশিয়ার ম্যাচে প্রতিপক্ষকে সহজ সুযোগ দেওয়ার যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল, সেটি পুনরায় হলে বিপদ বাড়তে পারে। তাই রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি মাঝমাঠে বল ধরে রাখা এবং দ্রুত আক্রমণ তৈরির দিকে নজর দিতে হবে।
আক্রমণভাগেও আগের ম্যাচের তুলনায় উন্নতি প্রয়োজন বাংলাদেশের। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় আক্রমণ তৈরি করতে পারেনি দল। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে সুযোগ তৈরি হলে সেগুলো কাজে লাগানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। কোচের বার্তা অনুযায়ী, শুধু রক্ষণাত্মক অবস্থানে থেকে নয়, বরং সুযোগ বুঝে সামনে উঠে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করেই খেলতে চাইবে বাংলাদেশ।
FIFA ASEAN Cup 2026-এর গ্রুপ ‘এ’-তে বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে হারের পর আজ সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে মাঠে নামছে বাংলাদেশ। এরপর ১ অক্টোবর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার মুখোমুখি হবে লাল-সবুজের দল।
এই পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজ ভালো ফল করতে পারলে পরের ম্যাচের আগে দলের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। বিপরীতে আবারও পরাজয় এলে গ্রুপ থেকে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সমীকরণ আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় শুরু হবে খেলা। জাকার্তার স্থানীয় সময় তখন বিকেল ৪টা। টুর্নামেন্টের সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশের পরবর্তী ম্যাচ ১ অক্টোবর স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
মালয়েশিয়ার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পর বাংলাদেশের সমর্থকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হলেও সিঙ্গাপুর ম্যাচকে ঘিরে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কোচ ও খেলোয়াড়দের বক্তব্যে আগের ম্যাচের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় স্পষ্ট।
বাংলাদেশের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়াও টুর্নামেন্টের আগে জানিয়েছিলেন, শক্তিশালী প্রতিপক্ষ থাকলেও নিজেদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রেখে পয়েন্ট অর্জনের লক্ষ্য নিয়েই দল মাঠে নামবে। সেই আত্মবিশ্বাস এবার মাঠের পারফরম্যান্সে কতটা দেখা যায়, সেটিই হবে দেখার বিষয়।
সব মিলিয়ে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ এক লড়াই। জয় পেতে হলে রক্ষণে শৃঙ্খলা, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণে কার্যকারিতা—তিনটি বিষয়েই উন্নতি করতে হবে। প্রথম ম্যাচের ভুলগুলো এড়িয়ে যদি শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে পারে বাংলাদেশ, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এখন অপেক্ষা জাকার্তার মাঠে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের পারফরম্যান্সের। বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া এই ম্যাচের দিকে তাকিয়ে থাকবে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা।