নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম কমলেও সাধারণ ভোক্তাদের জন্য এর সুফল পুরোপুরি মিলছে না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসের জন্য বেসরকারি পর্যায়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। আগস্টে একই পরিমাণ এলপিজির নির্ধারিত মূল্য ছিল ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। ফলে এক মাসের ব্যবধানে সরকারি নির্ধারিত দাম কমেছে ১৩ টাকা।
তবে নির্ধারিত দামের সঙ্গে খুচরা বাজারের বাস্তব চিত্রের বেশ পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথাও জানা গেছে। কোথাও আবার নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিইআরসির নির্ধারিত সেপ্টেম্বরের মূল্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি এলপিজির খুচরা দাম ভ্যাটসহ ১৩২ টাকা ১২ পয়সা। সে হিসাবে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের মূল্য দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কমিশনের নতুন নির্ধারিত দর ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
কাগজে-কলমে দাম কমলেও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকায় অনেক ভোক্তা নির্ধারিত দামে এলপিজি কিনতে পারছেন না। ফলে সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে তাদের। এতে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর মাসিক খরচেও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
এর আগে আগস্টে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। জুলাইয়ে এই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫২৮ টাকা। অর্থাৎ জুলাই থেকে আগস্টে দাম বাড়লেও সেপ্টেম্বর মাসে আবার ১৩ টাকা কমানো হয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে এলপিজির দামে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছিল। ওই মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের মূল্য ৩৫৭ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫২৮ টাকা করা হয়। এর আগে দাম ছিল ১ হাজার ৮৮৫ টাকা। ফলে জুলাইয়ে ভোক্তারা উল্লেখযোগ্য মূল্যহ্রাসের সুবিধা পেয়েছিলেন।
এরও আগে এপ্রিল মাসে এলপিজির দাম কয়েক দফায় বেড়েছিল। ১৯ এপ্রিল ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা করা হয়। এর আগে এপ্রিলের শুরুতে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ ওই মাসে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা দাম বেড়েছিল। পরে জুনে ৫৫ টাকা কমিয়ে দাম ১ হাজার ৮৮৫ টাকা এবং জুলাইয়ে আরও ৩৫৭ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এলপিজির বর্তমান বাজার পরিস্থিতির পেছনে সরবরাহ ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক মাসের ব্যবধানে দেশে এলপিজি আমদানি প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
দেশের এলপিজির বাজারদর আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও নির্ভরশীল। ফলে আমদানির পরিমাণ কমে গেলে বাজারে পণ্যের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে দামের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন সাধারণ ভোক্তারা। একটি পরিবারের রান্নার জন্য নিয়মিত এলপিজি প্রয়োজন হলে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কেনা তাদের মাসিক বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে কোনো এলাকায় যদি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার টাকার ওপরে উঠে যায়, তাহলে নির্ধারিত দামের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
শুধু বাসাবাড়ি নয়, এলপিজির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে পারে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও। হোটেল, রেস্তোরাঁ, বেকারি, খাবারের দোকানসহ রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে তাদের সামগ্রিক পরিচালন খরচও বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্য ও খাবারের দামে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভোক্তাদের দাবি, বিইআরসি যে মূল্য নির্ধারণ করেছে, বাজারে সেই দামেই এলপিজি বিক্রির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সরবরাহ সংকটকে কেন্দ্র করে কোনো ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন কি না, তা নিয়মিত তদারকির আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিইআরসির নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত দামে বোতলজাত এলপিজি বিক্রি না করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি নির্ধারিত মূল্য কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজির সরকারি নির্ধারিত দাম আগস্টের তুলনায় ১৩ টাকা কমেছে। কিন্তু বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে কিছু এলাকায় ভোক্তাদের ২ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকারি হিসাবে দাম কমলেও বাস্তব বাজারে অনেক মানুষের জন্য এলপিজি এখনো ব্যয়বহুলই রয়ে গেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের মূল প্রত্যাশা হলো দ্রুত এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপও কমতে পারে।
দামের সংক্ষিপ্ত হিসাব:
সেপ্টেম্বর ২০২৬ — ১,৫৮৫ টাকা
আগস্ট ২০২৬ — ১,৫৯৮ টাকা
জুলাই ২০২৬ — ১,৫২৮ টাকা
জুন ২০২৬ — ১,৮৮৫ টাকা
এপ্রিল ২০২৬ — ১,৯৪০ টাকা
কিছু এলাকায় বাজারদর — ২,০০০ টাকার বেশি