নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট
দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা সামাল দিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের পরিধি বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তি পর্যায়ের পাশাপাশি সরকারি ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও সৌর প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর গুলশানের বাসভবনেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভবনের ছাদে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ সরাসরি বাসভবনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। উৎপাদন বেশি হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডেও যুক্ত করা হচ্ছে।
সম্প্রতি এ বিষয়ে সরকারি পর্যায় থেকে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশের পর দেশে রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে আগ্রহী করার জন্য বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের কার্যক্রম অক্টোবরের শুরু থেকে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেখানে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্ব ব্যবহারে নেওয়া হয়েছে এবং বাড়তি উৎপাদনের একটি অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কার্যক্রম শুরুর পর কয়েক দিনে সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় এক হাজার ইউনিট বাসভবনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। একই সময়ে অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাস্তবে কীভাবে করা যায়, তার একটি উদাহরণ তৈরি হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনায় শুধু প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নয়, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি রয়েছে। বঙ্গভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয়, জাতীয় সংসদ, পরিকল্পনা কমিশন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরে পর্যায়ক্রমে সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়েও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, সরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হলে স্থানীয় মানুষও এর কার্যকারিতা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা। বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও সরকারি ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্বভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। উৎপাদন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হলে নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় সেই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।
রুফটপ সোলার ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করতে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়েও সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা এসেছে। নির্দিষ্ট নিয়ম ও সময়সীমার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলে অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকার নির্ধারিত ব্যবস্থায় কেনার সুযোগ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর ফলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের বিষয়ে উৎসাহিত হতে পারেন।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিভিন্ন সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ও করসংক্রান্ত সুবিধা থাকলে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রাথমিক ব্যয় কমতে পারে। এতে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের আগ্রহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়ির ছাদ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনের বড় অংশ এখনো বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না। এসব জায়গায় সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে অতিরিক্ত জমি ব্যবহার না করেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গ্যাস, তেল ও অন্যান্য প্রচলিত জ্বালানির সরবরাহ ও ব্যয়ের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই বিকল্প ও নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হবে।
পরিবেশের দিক থেকেও সৌরবিদ্যুৎকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সূর্যের আলো ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় বলে এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির অন্যতম প্রধান উৎস। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো গেলে কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে টেকসই করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। উন্নতমানের সৌর প্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারির সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে নিরাপদ সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার খরচ, সুবিধা ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়াও প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যক্তি ও বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। সহজ অর্থায়ন, উপযুক্ত নীতিমালা এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে রুফটপ সোলারের বিস্তার আরও দ্রুত হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উদ্যোগ এবং দেশের বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় সৌর প্যানেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হলে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথও আরও শক্তিশালী হতে পারে।