নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা লিচুবাগানে ডেঙ্গু প্রতিরোধ এবং জনসাধারণের মধ্যে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে সচেতনতামূলক র্যালি ও বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী সমাজ, বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক সংগঠন এবং যুবসমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
‘নিজের আঙিনা পরিষ্কার রাখি, সবাই মিলে সুস্থ থাকি’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং ডেঙ্গু জ্বরের ঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। একই সঙ্গে বাজার ও জনবহুল স্থানে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা অপসারণের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা হয়।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে লিচুবাগান এলাকার প্রধান সড়ক ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ কর্মসূচি শুরু হয়। প্রথমে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে একটি সচেতনতামূলক র্যালি বের করা হয়। র্যালিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ, মশার বংশবিস্তার রোধ এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। পরে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন করেন রাঙ্গুনিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) খন্দকার নাজনীন সেতু। কর্মসূচির শুরু থেকে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাজী ইলিয়াস সিকদার এবং চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শোয়েব কাদের। এ সময় বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন সংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মী এবং বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির রাঙ্গুনিয়া উপজেলা শাখার আহ্বায়ক ইমরান হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থেকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেন।
অভিযানের অংশ হিসেবে বাজারের বিভিন্ন অলিগলি, প্রধান সড়কের আশপাশ, দোকানপাটের সামনের অংশ এবং যত্রতত্র পড়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়। পাশাপাশি নালা-নর্দমা ও পানি জমে থাকার সম্ভাবনাময় স্থানগুলো পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হতে পারে—এমন স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ পরিচালনা করা হয়।
কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য শুধু চিকিৎসা বা হাসপাতালনির্ভর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। রোগের বিস্তার কমাতে হলে মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ দূর করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি, পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
র্যালি-পরবর্তী সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, পরিচ্ছন্ন ও ডেঙ্গুমুক্ত এলাকা গড়ে তোলা কোনো এক দিনের কর্মসূচি নয়। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থল—সব জায়গায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, অনেক সময় বাড়ির ছাদ, ফুলের টবের নিচের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসা এবং অব্যবহৃত বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে। তাই এসব জায়গা নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং জমে থাকা পানি অপসারণ করা জরুরি। বিশেষ করে বৃষ্টির পর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে পানি জমে আছে কি না, তা খেয়াল রাখতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন বক্তারা। তাঁদের মতে, নিজের ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি প্রতিবেশী ও আশপাশের পরিবেশের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে হবে। কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ, ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং নালা-নর্দমায় বর্জ্য না ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ নিয়মিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মশার প্রজননস্থল কমানোর পাশাপাশি এলাকার সামগ্রিক পরিবেশও উন্নত করা সম্ভব।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, লিচুবাগান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় এখানে প্রতিদিন বহু মানুষের যাতায়াত ঘটে। বাজারের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, ক্রেতা, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যও প্রয়োজন। দোকানের সামনে আবর্জনা জমতে না দেওয়া, ব্যবহৃত প্যাকেট ও প্লাস্টিক নির্ধারিত স্থানে ফেলা এবং দোকান বন্ধ করার আগে আশপাশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
অভিযানে স্থানীয় ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। তাঁদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে বাজার এলাকার বিভিন্ন স্থানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এ ধরনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী। তাঁরা মনে করেন, প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জনসাধারণকে সচেতন করার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়তা করে। তবে কর্মসূচির সুফল ধরে রাখতে নিয়মিত তদারকি এবং নাগরিকদের ধারাবাহিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতেও লিচুবাগানকে পরিচ্ছন্ন রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাঁরা দোকানপাট ও জনসমাগমস্থলে ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা, ডাস্টবিন ব্যবহার করা এবং যেখানে-সেখানে বর্জ্য না ফেলার বিষয়ে সচেতন থাকার অঙ্গীকার করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ সচেতনতামূলক পদক্ষেপ। তবে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে হলে নিয়মিতভাবে জমে থাকা পানি অপসারণ, সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরিষ্কার রাখা এবং জনসাধারণকে সচেতন করার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। প্রশাসন, ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে লিচুবাগানে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানোর প্রচেষ্টাও আরও জোরদার করা সম্ভব।