ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশের তারিখ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ২৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা দুটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাযন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার জন্য কেনা প্রায় ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর যন্ত্রটি এখনো বাক্সবন্দি। অন্যদিকে, হৃদ্রোগীদের চিকিৎসার জন্য ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা ক্যাথল্যাব প্রায় নয় বছরেও চালু করা যায়নি। এসব যন্ত্র কেনা হলেও কার্যকরভাবে ব্যবহার না করায় সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে ফরিদপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালটিতে টানা দুই দিনের অভিযান শেষে পাওয়া বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে দুদকের কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসাযন্ত্র অব্যবহৃত থাকার পাশাপাশি চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটা, অ্যাম্বুলেন্সের আয় জমা, আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ এবং রোগীদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
দুদকের ফরিদপুর জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে হাসপাতালের সেবাব্যবস্থা, কেনাকাটা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সংগৃহীত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
হাসপাতালের চিকিৎসাযন্ত্র কেনাকাটার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নেওয়া দুটি প্রকল্প নিয়ে। ওই অর্থবছরে ক্যান্সার ইউনিটের জন্য প্রায় ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর কেনা হয়। ক্যান্সার রোগীদের রেডিওথেরাপি দেওয়ার কাজে এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত না করেই যন্ত্রটি কেনা হয়েছিল। ফলে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
চিকিৎসা খাতে এমন ব্যয়বহুল যন্ত্র কেনার মূল উদ্দেশ্য হলো রোগীদের আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরকারি হাসপাতালে এ ধরনের যন্ত্র স্থাপন করা হলে রোগীরা তুলনামূলকভাবে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল ও পরিচালনাব্যবস্থা নিশ্চিত না করে যন্ত্র কেনা হলে সেই বিনিয়োগের সুফল রোগীদের কাছে পৌঁছায় না।
একই অর্থবছরে হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে প্রায় ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ক্যাথল্যাব স্থাপন করা হয়। হৃদ্রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ক্যাথল্যাব ব্যবহৃত হয়। তবে দুদকের তথ্য অনুযায়ী, স্থাপনের প্রায় নয় বছর পরও যন্ত্রটি কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। ফলে যে উদ্দেশ্যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে যন্ত্রটি স্থাপন করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি।
দুদকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যন্ত্র দুটি কার্যকরভাবে চালু না হলেও সংশ্লিষ্ট দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। বিষয়টি সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া, কাজ সম্পন্ন হওয়ার যাচাই এবং বিল পরিশোধের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে এ ঘটনায় কার কী ধরনের দায় রয়েছে, তা নথিপত্র যাচাই ও পরবর্তী তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে দুদক।
হাসপাতালের চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটাতেও তথ্যের গরমিল পাওয়া গেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। হাসপাতালের এমএসআর বা মেডিকেল সাপ্লাইস অ্যান্ড রিএজেন্টস খাতে ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনা হয়। এ খাতে কেনাকাটার হিসাব ও সরবরাহসংক্রান্ত নথিতে অসংগতি থাকার তথ্য পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে দুদক।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রমের সঙ্গে এসব উপকরণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কেনাকাটার হিসাব, সরবরাহের পরিমাণ এবং বাস্তবে পাওয়া সামগ্রীর মধ্যে পার্থক্য থাকলে হাসপাতালের সেবাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত চিত্র বের করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযানে হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের আয় জমা দেওয়ার বিষয়েও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। দুদকের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের পাঁচটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে দুটি নষ্ট এবং বাকি তিনটি চালু ছিল। কিন্তু অভিযানের আগে এক মাসে চালু অ্যাম্বুলেন্সগুলো থেকে আদায় করা ভাড়ার কোনো অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক।
সরকারি অ্যাম্বুলেন্স রোগীদের জরুরি পরিবহন ও চিকিৎসাসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব যানবাহন ব্যবহারের মাধ্যমে যে আয় হয়, তার হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত নিয়মে সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আয় জমা না হওয়ার বিষয়ে কোনো অনিয়ম, হিসাবের ঘাটতি বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করে দেখা হবে।
এ ছাড়া হাসপাতালের আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ এবং রোগীদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, রোগীদের হয়রানি এবং দালালচক্রের মাধ্যমে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর ঘটনা। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও প্রশাসনিক রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একটি বড় অংশ আর্থিকভাবে সীমিত সামর্থ্যের অধিকারী। তাঁরা কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার আশায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেন। এমন পরিস্থিতিতে রোগীদের হয়রানি, অনিয়মিত সেবা কিংবা দালালচক্রের প্রভাবের অভিযোগ উঠলে তা জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়। তবে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
দুদকের অভিযানটি সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১০টায় শুরু হয়ে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাত ৮টা পর্যন্ত চলে। আট সদস্যের একটি দল এ অভিযানে অংশ নেয়। অভিযানে সংগৃহীত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে হাসপাতালের কেনাকাটা, যন্ত্রপাতি স্থাপন, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা হবে।
এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত প্রতিবেদনে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. মনস কৃষ্ণ কুণ্ডুর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করেছে এবং অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির বিষয়ে আগে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছিল। এ বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণের অগ্রগতি এবং যন্ত্রগুলো চালু না হওয়ার প্রশাসনিক কারণ যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি অর্থে কেনা চিকিৎসাযন্ত্র দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার ঘটনা শুধু আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, এটি রোগীদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগের সঙ্গেও সম্পর্কিত। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্রপাতি চালু করা না গেলে একদিকে সরকারি বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যায় না, অন্যদিকে রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র যেতে হতে পারে।
এখন দুদকের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সংগৃহীত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে প্রকৃত অনিয়মের ধরন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব এবং সরকারি অর্থের ক্ষতির বিষয়টি নির্ধারণ করা। পাশাপাশি অব্যবহৃত যন্ত্রগুলো চালু করা সম্ভব কি না, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, সেসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দুদক জানিয়েছে, নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে দায় নির্ধারণ করে পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তবে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।