রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশের তারিখ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের উত্তর নোয়াগাঁও এলাকার শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রিফাত হাসান মুন্না এবার ফাজিল (ডিগ্রি) প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। গুরুতর শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার এই প্রচেষ্টা তার জন্য যেমন সাহসের, তেমনি শিক্ষা গ্রহণে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া তার পরীক্ষার কেন্দ্র রাঙ্গুনিয়ার আলমশাহ পাড়া কামিল মাদ্রাসা। তবে শারীরিক অক্ষমতার কারণে অন্য শিক্ষার্থীদের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা কিংবা নিজের হাতে লিখে পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ সহজ করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
রিফাত হাসান মুন্নার বাড়ি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর নোয়াগাঁও এলাকায়। তার শারীরিক অবস্থা এতটাই গুরুতর যে ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ার ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক কাজগুলোতেও তাকে মায়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। খাওয়ানো থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পরিচর্যার বিভিন্ন কাজে মা-ই তার প্রধান ভরসা।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলায় মুন্নার শারীরিক অবস্থা বর্তমানের মতো ছিল না। কিন্তু উন্নত চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়ায় সময়ের সঙ্গে তার শারীরিক অক্ষমতা বেড়েছে। বর্তমানে তার চলাফেরা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ধরে রেখে সে ফাজিল প্রথম বর্ষ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
মুন্নার জীবনের আরেকটি কষ্টকর দিক হলো, তার পরিবারে একই ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে আরও দুজন। পরিবারের তিন ভাইবোনই গুরুতর শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে স্বাভাবিক চলাফেরায় অক্ষম। ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও মুন্নার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু পরীক্ষার হলে প্রবেশ, আসন গ্রহণ, প্রশ্নের উত্তর লেখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিরতি নেওয়ার মতো বিষয়গুলো তার জন্য অন্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। উপযুক্ত সহায়তা না থাকলে শুধু শারীরিক অক্ষমতার কারণেই তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
অথচ একজন শিক্ষার্থীর শারীরিক সীমাবদ্ধতা যেন তার শিক্ষাজীবনের পথে অপ্রয়োজনীয় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটি নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মুন্নার মতো শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের উপযোগী ব্যবস্থা, সহজে যাতায়াতের সুবিধা, প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক আসন এবং প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী অতিরিক্ত সময় বা লেখক ব্যবহারের সুযোগ বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব সুবিধা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নিয়ম, অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা যেতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, মুন্নার শারীরিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ সহজ করার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। তবে এ বিষয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ, একজন শিক্ষার্থীর বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
যে মাদ্রাসায় মুন্না ছোটবেলা থেকে পড়াশোনা করে আসছে, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে তার প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। দীর্ঘদিনের শিক্ষার্থী হিসেবে তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনগুলো বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষার পরিবেশ আরও উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হলে তা হবে মানবিক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
এ অবস্থায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তা, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবং ফাজিল পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। মুন্না যাতে শারীরিক অক্ষমতার কারণে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য তার প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তার পরিস্থিতি তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে। একটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে অনিশ্চিত না হয়ে পড়ে, সে বিষয়ে সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
মুন্নার সংগ্রাম শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত লড়াই নয়; এটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষার অধিকার, মর্যাদা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। শারীরিকভাবে অসহায় হলেও তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রমাণ করে, উপযুক্ত পরিবেশ ও সহায়তা পেলে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরাও নিজেদের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতে পারে।
এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিক উদ্যোগ, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং মুন্নার পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা যেন শিক্ষার পথে বাধা না হয়—এটাই স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও সচেতন মানুষের কাছে প্রত্যাশা।
যোগাযোগ:রিফাত হাসান মুন্না
মোবাইল:+880 1830-902653