নিজস্ব প্রতিবেদক | AdChannel24.com
প্রকাশের তারিখ: ২০ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশের প্রতিটি বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা স্থাপন এবং ছাদবাগান গড়ে তোলা জন্য বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছেন জিসাস,চটগ্রাম উত্তর জেলা সভাপতি মুহাম্মমদ মঈন উদ্দীন। বিদ্যুতের ওপর প্রচলিত জ্বালানিনির্ভরতা কমানো, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, নগরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং সবুজায়ন বাড়ানোর লক্ষ্য সামনে রেখে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বর্তমান সময়ে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাড়ির অব্যবহৃত ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও গাছপালা চাষের কাজে ব্যবহার করা গেলে একই সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচিতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, প্রণোদনা এবং নেট মিটারিং-সংক্রান্ত নির্দেশিকা রয়েছে। ফলে বাড়ির ছাদকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি দেশের জ্বালানি পরিকল্পনার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়ির ছাদে স্থাপিত সোলার প্যানেল সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাড়ির বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। ব্যবস্থার ধরন ও অনুমোদিত সংযোগের ওপর নির্ভর করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগও থাকতে পারে। এতে প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর চাপ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বিশেষ করে শহরাঞ্চলের বহুতল ভবন, আবাসিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক স্থাপনার ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে। পরিকল্পিতভাবে এসব ছাদ ব্যবহার করা গেলে ভবনভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
তবে প্রতিটি বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে ভবনের ছাদের আয়তন, কাঠামোগত সক্ষমতা, সূর্যের আলো পাওয়ার সুযোগ, স্থাপনা নির্মাণের ব্যয় এবং পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। যেসব বাড়ির ছাদ ছোট, ছায়াচ্ছন্ন বা প্রযুক্তিগতভাবে উপযোগী নয়, সেসব ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা রাখাও জরুরি।
অন্যদিকে, ছাদবাগান নগরীর পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাড়ির ছাদে পরিকল্পিতভাবে শাকসবজি, ফলদ, ঔষধি ও শোভাবর্ধক গাছ লাগানো হলে সবুজ পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি পরিবারের জন্য কিছু তাজা শাকসবজি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে গাছপালা ছাদের ওপর সরাসরি সূর্যের তাপের প্রভাব কমাতে সহায়তা করতে পারে।
ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে ভবন ও পাকা সড়কের আধিক্যের কারণে সবুজ জায়গা সীমিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ছাদবাগান নগরীর সবুজায়ন বাড়ানোর একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। বাড়ির ছাদে গাছপালা বৃদ্ধি পেলে পাখি ও কিছু উপকারী পতঙ্গের জন্যও ছোট পরিসরে উপযোগী পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
তবে ছাদবাগান গড়ে তোলার আগে ভবনের ছাদ অতিরিক্ত ওজন বহনে সক্ষম কি না, তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। টব, মাটি, পানি ও গাছের সম্মিলিত ওজন ছাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, ছাদের জলরোধী স্তর এবং নিয়মিত পরিচর্যার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে ছাদবাগান স্থাপন করা উচিত।
সৌরবিদ্যুৎ ও ছাদবাগান একসঙ্গে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ছাদের জায়গা পরিকল্পিতভাবে ভাগ করা প্রয়োজন। সোলার প্যানেলের ওপর পর্যাপ্ত সূর্যালোক পড়তে হবে এবং গাছের কারণে প্যানেলে ছায়া পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে হবে। একই সঙ্গে গাছের পানি যেন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ক্ষতি না করে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
এ ধরনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, আবাসন প্রতিষ্ঠান এবং বাড়ির মালিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নতুন ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সবুজায়নের উপযোগী জায়গা রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পুরোনো ভবনের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রাখা যেতে পারে।
এ উদ্যোগ জনপ্রিয় করতে স্বল্পসুদে ঋণ, সহজ কিস্তিতে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম কেনার সুবিধা, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না দিয়ে সরকারি সহায়তা ও বাস্তবসম্মত নীতিমালার মাধ্যমে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তুলতে নাগরিকদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির ছাদে অল্প পরিসরে গাছ লাগানো, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুতের অপচয় কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মতো উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ এবং ছাদবাগান সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ জ্বালানি সাশ্রয়, নগরীর সবুজায়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে যেতে পারে।