নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘদিন ধরে ফল প্রকাশে বিলম্ব, সেশনজট এবং পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ অপেক্ষা—জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এসব সমস্যা নতুন নয়। এবার এসব ভোগান্তি কমাতে পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে উদ্যোগের কথা জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন মনে করছে, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা গেলে ফল প্রকাশের সময় অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
গাজীপুরে অবস্থিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, উপাচার্য প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহর নেতৃত্বে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তরকে ফল প্রকাশের কার্যক্রম দ্রুত করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পরীক্ষা ও ফল ব্যবস্থাপনার কাজকে আরও গতিশীল করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেশের দুই হাজারের বেশি কলেজে প্রায় ৩৫ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, নম্বর সংগ্রহ ও ফল প্রস্তুত করা একটি বড় প্রশাসনিক কার্যক্রম। অতীতে অনার্স, মাস্টার্স ও ডিগ্রি পরীক্ষার ফল প্রকাশে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, চাকরির আবেদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর অনার্স ফাইনাল ইয়ার পরীক্ষার ফল প্রকাশে ৮৯ দিন সময় লেগেছিল। তবে চলতি বছরে ২০২৪ সালের অনার্স চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষার ফল ৪৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এটিকে আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ জানিয়েছেন, অনার্স ফাইনাল ইয়ার পরীক্ষার ফল ৪৭ কর্মদিবসে প্রকাশ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। শিক্ষার্থীদের সময় ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষা গ্রহণ থেকে শুরু করে ফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ দ্রুত করার লক্ষ্যেই কাজ চলছে।
এবার সেই সময় আরও কমিয়ে ১৫ দিনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফল তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরীক্ষার উত্তরপত্র ডিজিটাল পদ্ধতিতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় কাগজের উত্তরপত্র সরাসরি শিক্ষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে তা স্ক্যান করে নির্দিষ্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকরা অনলাইনে উত্তরপত্র দেখে নম্বর দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে উত্তরপত্র পরিবহন, বিতরণ ও জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে যে অতিরিক্ত সময় লাগে, তা কমানো সম্ভব হবে।
এ ছাড়া বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর যাচাইয়ে ওএমআর প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নম্বর সংরক্ষণ ও ফল প্রস্তুতের বিভিন্ন ধাপে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে হাতে-কলমে তথ্য স্থানান্তরের প্রয়োজন কমবে এবং ভুলের আশঙ্কাও কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
দ্রুত ফল প্রকাশের জন্য পরীক্ষকসংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন কলেজের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়ে বড় পরীক্ষক পুল তৈরি করা হলে একই সময়ে বেশি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মূল্যায়ন শেষ করার জন্য পরীক্ষকদের সময়সীমাও নির্ধারণ করা হতে পারে।
ফল প্রস্তুতের কাজ শুধু গাজীপুরে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন আঞ্চলিক পর্যায়ে সম্পন্ন করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে এবং একই সময়ে একাধিক স্থানে ফল প্রস্তুতের কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে বড় সংখ্যক পরীক্ষার্থীর ফল তুলনামূলক কম সময়ে প্রকাশ করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। প্রায় দুই লাখ পরীক্ষার্থীর ডিগ্রি পাস কোর্সের ফল ৫০ দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। একইভাবে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ফল ৪২ কর্মদিবসে প্রকাশের নজিরও রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই এবার আরও কম সময়ে ফল প্রকাশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এ উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ফলের জন্য অপেক্ষা করতে না হলে চাকরির আবেদন, পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে ভর্তি এবং উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তারা দ্রুত অংশ নিতে পারবেন। বিশেষ করে অনার্স শেষ করার পর ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতার কারণে যেসব শিক্ষার্থী চাকরি বা মাস্টার্সে ভর্তির সুযোগ হারান, তাদের জন্য দ্রুত ফল প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অভিভাবকদের কাছেও বিষয়টি স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর চার বছরের অনার্স কোর্স শেষ করতে অতিরিক্ত সময় লেগেছে। পরীক্ষা ও ফল প্রকাশের সময় কমানো গেলে সামগ্রিকভাবে সেশনজট কমানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে দ্রুত ফল প্রকাশের পাশাপাশি মূল্যায়নের মান বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন শিক্ষকরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে গিয়ে যেন পরীক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয় এবং শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশাল একটি প্রতিষ্ঠানে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ করতে হলে শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত পরীক্ষক এবং কার্যকর প্রশাসনিক সমন্বয় প্রয়োজন। এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোগটি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের উদাহরণ হতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ২০২৬ সালের অনার্স প্রথম বর্ষ ও ডিগ্রি প্রথম বর্ষের পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন ব্যবস্থার কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে অনার্স দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষ এবং মাস্টার্স পরীক্ষার ফল প্রকাশেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। দ্রুত ফল প্রকাশের পাশাপাশি পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে সেশনজট কমানো এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে আরও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে ১৫ দিনের এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবে কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রযুক্তি, পরীক্ষক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় করা গেলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এখন শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা, কবে থেকে নতুন এই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হবে এবং প্রথম কোন পরীক্ষার ফল ১৫ দিনের মধ্যে প্রকাশ করা সম্ভব হয়।
MOHAMMAD MOINUDDIN