.

দুই গোলের লিড নিয়েও চাইনিজ তাইপের কাছে হার বাংলাদেশ নারী হকি দলের

দুই গোলের লিড নিয়েও চাইনিজ তাইপের কাছে হার বাংলাদেশ নারী হকি দলের ছবির ক্যাপশন : নিজস্ব প্রতিবেদকের ছবি ও তথ্যচিত্র
.

ক্রীড়া প্রতিবেদক

এশিয়ান গেমসে নারী হকির গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে জয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হয়েছে বাংলাদেশকে। জাপানের গিফু প্রিফেকচারাল গ্রিন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে দারুণ শুরু করেছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। একপর্যায়ে ২-১ গোলে এগিয়েও ম্যাচের শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবধান ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ার্ধে পরপর দুটি গোল হজম করায় শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে পরাজিত হয় দলটি।

ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে দুটি গোলই করেন কনা আক্তার। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে একসময় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে চলে এসেছিল। অন্যদিকে চাইনিজ তাইপের হয়ে দুটি গোল করেন হুয়াং ইউ-টিং। অপর গোলটি করেন ওয়াং ইউ-চিউ। ম্যাচের ফল বাংলাদেশের জন্য হতাশার হলেও কনা আক্তারের পারফরম্যান্স এবং প্রথমার্ধে দলের আক্রমণাত্মক ফুটবল—অথবা হকি খেলায় আক্রমণভাগের কার্যকর উপস্থিতি—ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা আশার জায়গা তৈরি করেছে।

ম্যাচের শুরু থেকেই চাইনিজ তাইপে আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে খেলতে থাকে। বাংলাদেশও নিজেদের রক্ষণ সামলে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করছিল। তবে ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটেই বাংলাদেশের রক্ষণ ভেদ করে গোল আদায় করে নেয় চাইনিজ তাইপে। হুয়াং ইউ-টিংয়ের গোলে এগিয়ে যায় তারা। শুরুতেই গোল হজম করায় বাংলাদেশের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হলেও খেলোয়াড়রা দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

প্রথম গোলের পর চাইনিজ তাইপে আরও আক্রমণ বাড়ানোর চেষ্টা করলেও বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ম্যাচে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে থাকে। মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে সুযোগ তৈরির চেষ্টা চালাতে থাকে লাল-সবুজের দল। এর ফল আসে দ্বিতীয় কোয়ার্টারে। ম্যাচের ১৯তম মিনিটে কনা আক্তার বাংলাদেশের হয়ে সমতাসূচক গোল করেন। তাঁর গোলে ম্যাচে নতুন প্রাণ ফিরে পায় বাংলাদেশ।

সমতায় ফেরার পর বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। আক্রমণভাগে খেলোয়াড়দের সমন্বয় বাড়তে থাকে এবং চাইনিজ তাইপের রক্ষণে চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয় দলটি। সমতাসূচক গোলের মাত্র পাঁচ মিনিট পর আবারও গোলের দেখা পান কনা আক্তার। তাঁর দ্বিতীয় গোলেই ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।

প্রথমার্ধের বাকি সময়ে নিজেদের লিড ধরে রাখার পাশাপাশি আরও সুযোগ তৈরির চেষ্টা করে বাংলাদেশ। অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া চাইনিজ তাইপে সমতায় ফেরার জন্য আক্রমণের মাত্রা বাড়ালেও বাংলাদেশের রক্ষণভাগ সেই চাপ সামলে নেয়। ফলে প্রথমার্ধ শেষ হয় বাংলাদেশের ২-১ গোলের এগিয়ে থাকা অবস্থায়।

দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য ম্যাচের চিত্র পাল্টে যায়। নিজেদের ভুলত্রুটি কাটিয়ে উঠে চাইনিজ তাইপে আক্রমণের গতি বাড়াতে থাকে। বাংলাদেশও পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে ব্যবধান বাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে চাইনিজ তাইপে বাংলাদেশের রক্ষণভাগের ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।

ম্যাচের ৪৫তম মিনিটে সেই চাপের ফল আসে। ওয়াং ইউ-চিউ গোল করে চাইনিজ তাইপেকে আবারও সমতায় ফেরান। ২-২ গোলে ম্যাচ সমতায় আসার পর দুই দলের খেলাতেই উত্তেজনা বাড়ে। বাংলাদেশ চেষ্টা করছিল নিজেদের রক্ষণ শক্ত রেখে দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার। তবে চাইনিজ তাইপে তখন momentum কাজে লাগিয়ে আরও একবার গোলের সুযোগ তৈরি করে।

সমতায় ফেরার মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা আসে। হুয়াং ইউ-টিং নিজের দ্বিতীয় গোল করে চাইনিজ তাইপেকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। ফলে যে ম্যাচে একসময় বাংলাদেশ ২-১ গোলে এগিয়ে ছিল, সেই ম্যাচেই মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে দলটি।

শেষ দিকে বাংলাদেশ সর্বশক্তি দিয়ে সমতায় ফেরার চেষ্টা করে। আক্রমণভাগে চাপ বাড়ানো হয় এবং চাইনিজ তাইপের রক্ষণে সুযোগ তৈরির চেষ্টা চালানো হয়। কয়েকটি আক্রমণ থেকে সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কাঙ্ক্ষিত গোলটি আর পাওয়া যায়নি। ফলে ৩-২ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে চাইনিজ তাইপে।

এই হারের মধ্য দিয়ে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের নারী হকি দলের অভিযান শেষ হয়েছে। পাঁচ ম্যাচে বাংলাদেশের সংগ্রহ মাত্র এক পয়েন্ট। দলটি চার ম্যাচে পরাজিত হয়েছে এবং একটি ম্যাচে ড্র করেছে। বাংলাদেশের একমাত্র পয়েন্ট এসেছে কাজাখস্তানের বিপক্ষে ৩-৩ গোলের ড্র থেকে।

গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের জন্য এবারের পথটা মোটেও সহজ ছিল না। শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের বিপক্ষে খেলতে গিয়ে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের মুখেও পড়তে হয়েছে দলটিকে। চীনের বিপক্ষে বাংলাদেশ ১৩-০ গোলে হেরেছে। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে পরাজয়ের ব্যবধান ছিল ৩-১ গোল। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষেও বড় ব্যবধানে, ৮-০ গোলে পরাজিত হয়েছে বাংলাদেশ।

তবে এসব ফলাফলের মাঝেও চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ ম্যাচের শুরুতে পিছিয়ে পড়ার পরও দলটি দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ ব্যবধানে লিড নিতে সক্ষম হয়েছিল। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এমন প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতার একটি দিক তুলে ধরেছে।

বিশেষ করে কনা আক্তারের পারফরম্যান্স ছিল উল্লেখ করার মতো। দলের কঠিন মুহূর্তে তিনি পরপর দুটি গোল করে বাংলাদেশকে শুধু ম্যাচে ফেরাননি, একপর্যায়ে দলকে জয়ের অবস্থানেও নিয়ে গিয়েছিলেন। পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে তাঁর করা দুটি গোল বাংলাদেশের আক্রমণভাগের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত দল জয় পায়নি, তবে ব্যক্তিগতভাবে কনা আক্তারের এই পারফরম্যান্স দলের জন্য ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এবারের এশিয়ান গেমসের অভিজ্ঞতা অবশ্যই মূল্যায়নের বিষয়। গ্রুপ পর্বে প্রতিপক্ষদের শক্তি, নিজেদের দুর্বলতা এবং ম্যাচের বিভিন্ন পর্যায়ে কৌশলগত ঘাটতি—সবকিছু বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে কোনো ম্যাচে এগিয়ে যাওয়ার পর সেই সুবিধা ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও উন্নতি করতে হবে।

চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে বাংলাদেশের পরাজয়ের অন্যতম বড় শিক্ষা হতে পারে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের পারফরম্যান্স। প্রথমার্ধে ২-১ গোলে এগিয়ে থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল হজম করায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক হকিতে প্রতিপক্ষ যখন চাপ বাড়ায়, তখন রক্ষণভাগের সংগঠন, দ্রুত পজিশন পরিবর্তন এবং গোলের সামনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও পরিণত হতে হবে বাংলাদেশকে।

একই সঙ্গে আক্রমণভাগের খেলাতেও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। কনা আক্তারের মতো খেলোয়াড়রা সুযোগ তৈরি ও গোল করার সক্ষমতা দেখালেও পুরো ম্যাচজুড়ে সেই আক্রমণাত্মক ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পারলে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ফল পাওয়া কঠিন। তাই ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিতে আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

গ্রুপ পর্বে মাত্র এক পয়েন্ট নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করলেও চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে বাংলাদেশের লড়াইয়ের ধরন দেখিয়েছে, দলটি পুরোপুরি পিছিয়ে নেই। সঠিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতা এবং খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে আরও ভালো ফল করা সম্ভব।

বাংলাদেশ নারী হকি দলের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই টুর্নামেন্টের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো। বড় ব্যবধানে হারের ম্যাচগুলো থেকে ভুলগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি যে ম্যাচগুলোতে ইতিবাচক পারফরম্যান্স এসেছে, সেগুলোর ভালো দিকগুলোও ধরে রাখতে হবে। বিশেষ করে চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে প্রথমার্ধে ২-১ গোলে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়মিত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলার সুযোগ বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের নারী হকি দলও ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারবে। শুধু টুর্নামেন্টের সময় প্রস্তুতি নয়, বছরজুড়ে নিয়মিত অনুশীলন, আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে খেলোয়াড়দের যুক্ত রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি তরুণ খেলোয়াড়দের জাতীয় দলের পাইপলাইনে নিয়ে আসাও গুরুত্বপূর্ণ।

এশিয়ান গেমসের গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের যাত্রা জয় দিয়ে শেষ না হলেও চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ম্যাচটি দলের সম্ভাবনার একটি চিত্র তুলে ধরেছে। পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে লিড নেওয়া এবং প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করার সক্ষমতা বাংলাদেশ দেখিয়েছে। এখন সেই পারফরম্যান্সকে আরও ধারাবাহিক করা এবং ম্যাচের শেষ পর্যন্ত নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হারলেও বাংলাদেশের নারী হকি দলের জন্য এই ম্যাচটি শুধু একটি পরাজয়ের গল্প নয়। বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়ার একটি সুযোগ। কনা আক্তারের জোড়া গোল, প্রথমার্ধে দলের লড়াই এবং এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য প্রমাণ করেছে সঠিক প্রস্তুতি ও কৌশল কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এখন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর অনুশীলন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বেশি ম্যাচ খেলার বিকল্প নেই।




নিউজটি পোস্ট করেছেন : MOHAMMAD MOINUDDIN

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সরফভাটা ইউপি নির্বাচনে মেম্বার পদপ্রার্থী মাহবুল আলমের সমর্থ

সরফভাটা ইউপি নির্বাচনে মেম্বার পদপ্রার্থী মাহবুল আলমের সমর্থ