প্রকাশের তারিখ:১২ অক্টোবর ২০২৬
বরিশাল প্রতিনিধি:
বরিশাল নগরীর গুরুত্বপূর্ণ চৌমাথা এলাকায় সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট ও অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালিয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা এবং ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার লক্ষ্যে পরিচালিত এ অভিযানে বিভিন্ন দোকান ও অস্থায়ী স্থাপনা সরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের একাংশ দখল করে বসানো লোহার বক্স স্টলসহ অর্ধশতাধিক ভাসমান দোকান উচ্ছেদের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) বেলা ১১টা থেকে পৌনে ১২টার মধ্যে নগরীর চৌমাথা বাজারের সামনের অংশ থেকে অভিযান শুরু হয়। পরে বাজারের আশপাশ, সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের সামনের অংশ এবং চৌমাথা লেকসংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অভিযানের নেতৃত্ব দেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রায়হান উজ জামান। [সূত্র: বাসস ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যম]
চৌমাথা বাজার থেকে শুরু হয় অভিযান
বরিশাল নগরীর চৌমাথা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও যোগাযোগকেন্দ্র। এ এলাকার বাজার, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে প্রতিদিন বহু মানুষের চলাচল রয়েছে। ফলে সড়ক ও ফুটপাতের ওপর দোকানপাট বসানো হলে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সিটি করপোরেশনের পরিচালিত অভিযানের শুরুতে চৌমাথা বাজারের সামনের অংশে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে বসানো অস্থায়ী দোকানপাট ও স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরে আশপাশের এলাকাতেও অভিযান সম্প্রসারণ করা হয়।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের চৌমাথা সিটি মার্কেটসংলগ্ন অংশে বসানো লোহার বক্স স্টলও অভিযানের আওতায় আসে। সেখানে স্থাপিত ২০টি ফলের দোকানের বক্স স্টল ভেঙে ফেলার খবর প্রকাশ করেছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। একই প্রতিবেদনে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক ভাসমান দোকান উচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের অভিযান সড়ক ও ফুটপাতের ওপর অস্থায়ী স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের চলমান কার্যক্রমের অংশ বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যে উঠে এসেছে।
হাতেম আলী কলেজ ও চৌমাথা লেক এলাকাতেও অভিযান
চৌমাথা বাজারের সামনের অংশে অভিযান শুরুর পর আশপাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের সামনের অংশ এবং চৌমাথা লেকসংলগ্ন এলাকা রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে সড়ক ও ফুটপাত চলাচলের উপযোগী রাখা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং অন্যান্য পথচারী প্রতিদিন এসব এলাকা ব্যবহার করেন। ফুটপাত বাধাগ্রস্ত হলে অনেক সময় পথচারীদের মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়। এতে যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং যান চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে, চৌমাথা লেকসংলগ্ন এলাকায় মানুষের চলাচল ও নগরীর পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থানের আশপাশে সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা গেলে সাধারণ মানুষের চলাচল সহজ করার পাশাপাশি এলাকার ব্যবস্থাপনাও উন্নত করা সম্ভব।
তবে অভিযান পরিচালিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো কতটা স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে নিয়মিত তদারকি এবং পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর।
অভিযানের নেতৃত্বে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট
বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রায়হান উজ জামানের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ শাখার প্রধান লতিকুল্লাহ, ট্রেড লাইসেন্স বিভাগের আজিজ শাহীন এবং হাটবাজার শাখার প্রধান রেজাউল উপস্থিত ছিলেন।
অভিযান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রায়হান উজ জামান জানান, নগরীর ফুটপাত দখলমুক্ত ও চলাচলের উপযোগী রাখতে বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় চৌমাথা এলাকায় এ কার্যক্রম চালানো হয়েছে। তিনি জানান, এ ধরনের কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
সিটি করপোরেশনের এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নগরীর একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে অভিযান সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন স্থানে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বারবার দখলের অভিযোগ, স্থায়ী সমাধান নিয়ে প্রশ্ন
চৌমাথা এলাকায় ফুটপাত দখল নিয়ে এর আগেও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে অভিযান শেষ হওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যে আবার কিছু স্থানে দোকানপাট বসানোর অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি নগর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো এলাকায় একবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই সেখানে দীর্ঘমেয়াদে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। নিয়মিত তদারকি না থাকলে অস্থায়ী দোকানপাট আবারও ফুটপাত বা সড়কের অংশ দখল করে বসতে পারে।
ফলে উচ্ছেদ কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিকল্পনা। কোথায় দোকান বসানো যাবে, কোথায় পথচারীদের চলাচলের জায়গা সংরক্ষিত থাকবে এবং কীভাবে সড়কের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যবস্থাপনা থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সহজ হতে পারে।
তবে অভিযানের পর আবার দোকান বসানোর অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও অস্থায়ী দোকানের সঙ্গে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকা জড়িত। ফল, সবজি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিংবা অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি করে অনেকেই তাঁদের দৈনন্দিন আয় নির্বাহ করেন।
তাই নগরীর শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। নির্ধারিত স্থানে ব্যবসার সুযোগ, বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং বৈধভাবে দোকান পরিচালনার নিয়ম সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা গেলে সংশ্লিষ্ট সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিকল্প স্থান নির্ধারণ বা পুনর্বাসনের কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত এ অভিযানের সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
যানজট কমাতে দখলমুক্ত ফুটপাতের গুরুত্ব
নগরীর ফুটপাত পথচারীদের নিরাপদে চলাচলের জন্য তৈরি। কিন্তু ফুটপাতের ওপর দোকানপাট বা বিভিন্ন স্থাপনা থাকলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে সড়কে নামতে হয়। একই সঙ্গে রাস্তার একাংশ দোকান বা পণ্য রাখার কাজে ব্যবহৃত হলে যানবাহনের চলাচলের জায়গা সংকুচিত হতে পারে।
চৌমাথার মতো ব্যস্ত এলাকায় এ সমস্যা আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে আসা ক্রেতা, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিদিন চলাচলের প্রয়োজন হয়। তাই ফুটপাতের নির্ধারিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে জনসাধারণের চলাচল সহজ হতে পারে।
এ ছাড়া ফুটপাত দখলমুক্ত থাকলে বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং চলাচলে সহায়তা প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের জন্যও পথ ব্যবহার করা তুলনামূলক সহজ হয়। নিরাপদ ও পরিকল্পিত নগর পরিবেশ গড়ে তুলতে সড়ক ও ফুটপাতের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিয়মিত তদারকির ওপর নির্ভর করছে কার্যক্রমের সফলতা
বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের বক্তব্য অনুযায়ী, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এ ঘোষণা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে পুনরায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য নির্ধারিত নিয়ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া এবং জনসাধারণের অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব।
স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সড়ক ও ফুটপাতের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে নগরবাসী উপকৃত হতে পারেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা
বরিশাল নগরীর সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগকে কার্যকর করতে হলে উচ্ছেদ অভিযানকে নিয়মিত নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, পরবর্তী সময়ে দখল প্রতিরোধ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
চৌমাথা বাজার, হাতেম আলী কলেজের সামনের অংশ এবং চৌমাথা লেকসংলগ্ন এলাকায় পরিচালিত এ অভিযানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন এসব স্থান কতটা চলাচল উপযোগী থাকে এবং ভবিষ্যতে পুনরায় দখল ঠেকাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, বরিশাল সিটি করপোরেশনের এ উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হবে। এতে একদিকে যেমন পথচারীদের চলাচল সহজ হবে, অন্যদিকে সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নগরীর সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নের পথও সুগম হতে পারে।
MOHAMMAD MOINUDDIN