নিজস্ব প্রতিবেদক | AdChannel24.com
প্রকাশের তারিখ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্বজুড়ে উদ্ভিদ, প্রাণী ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় নেওয়া উদ্যোগ প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দেশগুলোর নির্ধারিত জাতীয় লক্ষ্যগুলোর অর্ধেকেরও কম সঠিক পথে এগোচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমি ধ্বংস, প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং পরিবেশের ওপর মানুষের ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে জীববৈচিত্র্য রক্ষার বৈশ্বিক উদ্যোগ আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
জাতিসংঘের জেনেভা কার্যালয়ের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে উদ্ভিদ, প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষার জন্য নির্ধারিত জাতীয় লক্ষ্যগুলোর অর্ধেকেরও কম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯ অক্টোবর থেকে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের ১৭তম অধিবেশন, যা COP17 নামে পরিচিত। ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে এই সম্মেলনের। এতে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা জীববৈচিত্র্য রক্ষার অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশন (Convention on Biological Diversity—CBD) অনুযায়ী, এবারের সম্মেলন কুনমিং–মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নে সম্মিলিত বৈশ্বিক অগ্রগতির প্রথম পর্যালোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই কাঠামোর লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা।
বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য মানুষের খাদ্য, সুপেয় পানি, ওষুধ, কৃষি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বন, নদী, জলাভূমি, সমুদ্র ও অন্যান্য প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব শুধু বন্য প্রাণী বা উদ্ভিদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জীবিকাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং ভূমির অপরিকল্পিত ব্যবহার অনেক প্রজাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে। কৃষি সম্প্রসারণ, নগরায়ণ, বন উজাড়, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন একসঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে শুধু সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; এসব এলাকার কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে জাতীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে পিছিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে, তা আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এনেছে। একটি দেশ জীববৈচিত্র্য রক্ষার পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ ছাড়া সেই পরিকল্পনার প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন।
এ কারণে ইয়েরেভেন সম্মেলনে দেশগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়নের পাশাপাশি বাস্তবায়নের বাধাগুলো চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোন দেশ কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কীভাবে সেই ঘাটতি পূরণ করা যায়—এসব বিষয় আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। তবে সম্মেলনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নতুন অঙ্গীকার সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পেতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
কুনমিং–মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় দেশগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পরিকল্পনা, লক্ষ্য এবং প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত CBD-এর তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১২৫টি দেশ তাদের সপ্তম জাতীয় প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। এসব প্রতিবেদন বৈশ্বিক পর্যায়ে অগ্রগতি মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে প্রতিবেদন জমা দেওয়া এবং বাস্তবে প্রকৃতির উন্নতি ঘটানো এক বিষয় নয়। কোনো দেশের পরিকল্পনায় বন সংরক্ষণ, জলাভূমি পুনরুদ্ধার বা বিপন্ন প্রজাতি রক্ষার কথা থাকলেও বাস্তবায়নের ফলাফল যাচাই করা প্রয়োজন। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অবস্থা, প্রজাতির সংখ্যা, আবাসস্থলের পরিবর্তন এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অগ্রগতির বাস্তব চিত্র পাওয়া সম্ভব।
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অর্থায়নও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উন্নয়নশীল অনেক দেশের জন্য সংরক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা, গবেষণা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে পর্যাপ্ত অর্থ ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বরাদ্দ অর্থ যেন স্বচ্ছভাবে ব্যবহৃত হয় এবং প্রকৃত সংরক্ষণ কার্যক্রমে সুফল আনে, তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্যও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, উপকূলীয় অঞ্চল, নদী, হাওর, জলাভূমি এবং পাহাড়ি বন বহু প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল। এসব প্রাকৃতিক পরিবেশ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব কমাতে, মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করতে এবং মানুষের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।
দেশে বনভূমি ও জলাভূমি সংরক্ষণ, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা, প্লাস্টিক ও অন্যান্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করা তাই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করা প্রয়োজন, কারণ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন কঠিন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারগুলোর পাশাপাশি গবেষক, পরিবেশবাদী সংগঠন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষেরও ভূমিকা রয়েছে। বন ও জলাভূমি ধ্বংস রোধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, প্রাকৃতিক সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং পরিবেশগত আইন মেনে চলার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
জাতিসংঘের সতর্কবার্তা মূলত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—প্রকৃতি রক্ষায় প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করার পাশাপাশি বাস্তব ফলাফল অর্জন জরুরি। ইয়েরেভেনে শুরু হতে যাওয়া COP17 সম্মেলনে দেশগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণের মধ্য দিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জনে নতুন গতি তৈরি হয় কি না, এখন সেদিকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি।
তথ্যসূত্র:জাতিসংঘের জেনেভা কার্যালয় (UN Geneva), ১৫ ও ১৮ অক্টোবর ২০২৬; জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশন (CBD), COP17-এর সরকারি তথ্য ও ২০২৬ সালের জাতীয় প্রতিবেদনসংক্রান্ত প্রকাশনা।
Jesmin khan