নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষাবিস্তার ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বদিউল আলম চৌধুরী ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, সমাজসেবা, রাজনীতি ও ব্যবসা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা চট্টগ্রামের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
জীবনীভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, বদিউল আলম চৌধুরী ১৯৩২ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলীর ঐতিহ্যবাহী এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ওহিদুল আলম চৌধুরী এবং মাতা সুলতানারা বেগম চৌধুরী। মাত্র এক বছর বয়সে পিতাকে হারানোর পর তিনি দাদা আলহাজ্জ ফয়েজ আলী চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।
১৯৬৪ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার তৎকালীন জমিদার পরিবারের কন্যা লুৎফা বেগম সুরাইয়া চৌধুরীকে বিয়ে করেন। তাঁদের ছয় সন্তান পরবর্তীতে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হন।
ঐতিহ্যবাহী পরিবারের উত্তরসূরি
বদিউল আলম চৌধুরীর পারিবারিক ইতিহাসও চট্টগ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে মোহাম্মদ ইলিয়াস খাঁ, মোহাম্মদ হাশিম নাজির খাঁ চৌধুরীসহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনকল্যাণে অবদান রাখেন।
জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, অবিভক্ত ভারতের প্রথম দিকের জাতীয় শিপিং প্রতিষ্ঠান ‘ইন্দো-বার্মা স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি’র সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততা ছিল। একই সঙ্গে শিক্ষা ও চিকিৎসা বিস্তারের জন্য জমি দান, বিদ্যালয় ও দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা এবং মসজিদ-মাদ্রাসায় আর্থিক সহযোগিতার মতো জনহিতকর কর্মকাণ্ডও পরিবারের ঐতিহ্যের অংশ ছিল।
এই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের কাট্টলী এলাকায় শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রসারে পরিবারের বিভিন্ন সদস্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নারী শিক্ষার প্রসারেও তাঁদের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা
বদিউল আলম চৌধুরীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। জীবনীতে বলা হয়েছে, ১৯৪৮ সাল থেকেই তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
তমদ্দুন মজলিশের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি সভা, মিছিল ও প্রচার কার্যক্রমে অংশ নেন। বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রচারপত্র বিতরণ এবং ভাষাবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতেও তাঁর অংশগ্রহণের কথা জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তমদ্দুন মজলিশের চট্টগ্রাম শাখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পরবর্তী সময়ে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ‘ভাষা আন্দোলন সম্মাননা পদক’ লাভ করেন বলেও উল্লেখ রয়েছে।
রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ
রাজনীতিতেও বদিউল আলম চৌধুরীর দীর্ঘ ভূমিকার কথা উঠে এসেছে তাঁর জীবনীতে। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য থেকে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, ডবলমুরিং ও সীতাকুণ্ড এলাকায় তিনি সক্রিয়ভাবে প্রচারণায় অংশ নেন এবং যুক্তফ্রন্টের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর কাছে জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের পক্ষ থেকেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রস্তাব এসেছিল বলে জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনার পদেও তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদান
শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল বদিউল আলম চৌধুরীর। কাট্টলী নূরুল হক চৌধুরী হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সহ-সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়নে জমি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন।
তাঁর সময়েই বিদ্যালয়ের ভবনের সম্প্রসারণ, বিজ্ঞান গবেষণাগার এবং শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের মতো বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে বলে জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া কাট্টলী নূরুল হক চৌধুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িত। দীর্ঘ সময় তিনি ওই বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ফয়েজ আলী চৌধুরী মেমোরিয়াল কিন্ডারগার্টেনসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যবসায় সাদাসিধে জীবন
ব্যবসা ছিল তাঁর পারিবারিক পেশার অংশ হলেও ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রতি তাঁর অতিরিক্ত আগ্রহ ছিল না। জীবনীতে বলা হয়েছে, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত আয় দিয়েই তিনি মূলত সংসার পরিচালনা করতেন।
কাট্টলী ও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় থাকা পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ‘কর্নেল হাট বিপণি বিতান’-এর আয় তাঁর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম ভিত্তি ছিল। তবে নিজের ব্যবসা বড় করার চেয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজ করাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক ‘নাজির বাড়ি’র সঙ্গে সম্পর্ক
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘নাজির বাড়ি’ও বদিউল আলম চৌধুরীর পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে এ বাড়িতে ওলি-দরবেশ, পীর-মুর্শিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আগমন ঘটেছে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, সাহিত্যিক মাহবুবুল আলম ও সাংবাদিক আবদুস সালামসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি এ বাড়িতে এসেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বেরও এখানে আগমন ঘটেছিল।
এ কারণে নাজির বাড়ি শুধু একটি পারিবারিক আবাসস্থল নয়, চট্টগ্রামের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
স্মরণীয় হয়ে আছে তাঁর অবদান
বদিউল আলম চৌধুরীর জীবনকে শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাঁর সামগ্রিক অবদান পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরা সম্ভব নয়। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, সমাজসেবা, জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত ছিলেন।
তাঁর জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক চট্টগ্রামের ইতিহাস, শিক্ষা ও সমাজসেবার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে বদিউল আলম চৌধুরীর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হলে চট্টগ্রামের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও সামনে আসবে।
তথ্যসূত্র: সংযুক্ত জীবনীভিত্তিক লেখায় বর্ণিত তথ্য।
MOHAMMAD MOINUDDIN