রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশের তারিখ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও দলীয়করণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উপজেলা প্রশাসন ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা দেওয়ার অভিযোগে মামলা করেছে উপজেলা প্রশাসন। মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) গোদাগাড়ীতে সার ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দলীয়করণের অভিযোগ তুলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহানের অপসারণ দাবিতে বিক্ষোভ করেন কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। কর্মসূচির একপর্যায়ে উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকে তালা দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি এবং সেবা নিতে আসা মানুষের ভোগান্তির অভিযোগে আইনগত পদক্ষেপ নেয় উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ইউএনও কার্যালয়ের উপসহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোক্তার হোসেন বাদী হয়ে সোমবার রাতে গোদাগাড়ী মডেল থানায় মামলাটি করেন। মামলার এজাহারে সাতজনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে মামলায় নাম থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি এবং এতে দলীয় প্রভাব কাজ করেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁরা ইউএনওর অপসারণ দাবি করেন। তবে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সত্যিই কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, নিয়োগের শর্ত, আবেদনকারীদের যোগ্যতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে, উপজেলা প্রশাসনের অভিযোগ, কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা দেওয়ার ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবা নিতে আসা ব্যক্তিরা ভোগান্তিতে পড়েন এবং দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সরকারি কার্যালয়ে এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে মামলার এজাহার, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং পুলিশের তদন্তের ফলাফল বিবেচনা করা জরুরি।
প্রকাশিত সংবাদে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা আতিকুর রহমানের বক্তব্যও উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে ইউএনওর কাছে জবাব চাওয়া হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করার পর তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আতিকুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, লিখিতভাবে অভিযোগ জানালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে এ বক্তব্য আন্দোলনকারীদের নিজস্ব দাবি; এর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ইউএনও ইসরাত জাহান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কার্যালয়ের সামনে এসে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাপ্রার্থীদের আটকে রেখে তালা দেওয়ার ঘটনার ভিত্তিতেই মামলা করা হয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে আন্দোলনকারীরা সার ডিলার নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসন সরকারি কাজে বাধা ও জনভোগান্তির বিষয়টি সামনে এনেছে। দুটি বিষয়ই নিরপেক্ষভাবে তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) তাঁদের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের খবর পাওয়া যায়। সেখানে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলা হয়। ফলে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধটি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
গোদাগাড়ীর এই ঘটনা সার ডিলার নিয়োগের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে। কৃষকদের জন্য সার সরবরাহ এবং ন্যায্য দামে সার পাওয়ার বিষয়টি কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ কারণে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নীতিমালা, যোগ্যতার শর্ত এবং সিদ্ধান্তের ভিত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা এবং অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়া জনআস্থা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
একই সঙ্গে সরকারি কার্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং সেবা নিতে আসা মানুষের অধিকার সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রে আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য, প্রমাণ এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা উচিত।
মামলার বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার পর পুলিশ আইনগত কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত মামলার তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল, সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি কিংবা আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এবং কার্যালয়ে তালা দেওয়ার ঘটনায় দায় নির্ধারণ—দুটিই তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া, আন্দোলনকারীদের অভিযোগ এবং কার্যালয়ে তালা দেওয়ার ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে বলে আশা করা যায়। এর মধ্য দিয়ে গোদাগাড়ীতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং কৃষকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের জবাব পাওয়া সম্ভব হবে
Jashim uddin