নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ মানুষের জীবনযাত্রার ধরন অনেকটাই বদলে দিয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, যোগাযোগ, বিনোদন, গবেষণা কিংবা ব্যক্তিগত নানা প্রয়োজনে এখন ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের পরিচিত হয়ে উঠেছে গুগলের বিভিন্ন সেবা। প্রয়োজনীয় তথ্য খোঁজা থেকে শুরু করে ই-মেইল, অনলাইন মানচিত্র, ভিডিও দেখা, ফাইল সংরক্ষণসহ নানা কাজে গুগলের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইন্টারনেটে কোনো বিষয়ে তথ্য খুঁজতে গুগল সার্চ ব্যবহার করা বর্তমানে খুবই সাধারণ বিষয়। কয়েকটি শব্দ লিখে অনুসন্ধান করলেই বিভিন্ন ওয়েবসাইট, সংবাদ, ছবি, ভিডিও, গবেষণামূলক উপকরণ ও অন্যান্য তথ্য সামনে আসে। এর ফলে কোনো নির্দিষ্ট তথ্যের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে বই বা বিভিন্ন উৎস খুঁজে বেড়ানোর প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে।
শিক্ষার্থীদের জন্যও গুগলসহ বিভিন্ন অনলাইন সেবা পড়াশোনায় সহায়ক হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা, শিক্ষামূলক ভিডিও, অনলাইন বই, গবেষণাপত্র ও অন্যান্য উপকরণ সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। পাশাপাশি অনলাইন ক্লাস, নোট তৈরি, তথ্য সংরক্ষণ এবং সহপাঠীদের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে শিক্ষার উপকরণ বা বিশেষজ্ঞ সহায়তা সহজে পাওয়া যায় না, সেসব জায়গার শিক্ষার্থীরাও ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষামূলক উৎসে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে। তবে অনলাইনে পাওয়া প্রতিটি তথ্য নির্ভুল—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। কোনো তথ্য ব্যবহারের আগে তার উৎস, প্রকাশের সময় এবং নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
দৈনন্দিন যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুগলের বিভিন্ন সেবা মানুষের কাজ সহজ করেছে। জিমেইলের মাধ্যমে দ্রুত ই-মেইল আদান-প্রদান করা যায়। গুগল ড্রাইভে প্রয়োজনীয় নথি ও ফাইল অনলাইনে সংরক্ষণ করা যায় এবং বিভিন্ন ডিভাইস থেকে সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। অনলাইন ডকুমেন্ট ও স্প্রেডশিটের মতো সুবিধা ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তি একই কাজেও অংশ নিতে পারেন।
অচেনা জায়গায় যাওয়ার ক্ষেত্রে গুগল ম্যাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কোনো স্থানের অবস্থান, যাতায়াতের পথ এবং সম্ভাব্য গন্তব্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় ডিজিটাল মানচিত্রের মাধ্যমে। ভ্রমণকারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী কিংবা জরুরি প্রয়োজনে চলাচলকারী মানুষের জন্য এ ধরনের প্রযুক্তি সময় ও শ্রম কমাতে সহায়তা করছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গুগলের বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ছোট উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত অনলাইনে নিজেদের পণ্য ও সেবা মানুষের কাছে তুলে ধরছে। ওয়েবসাইট, অনলাইন বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন ডিজিটাল বিশ্লেষণী ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি নিজেদের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা নিতে পারছে।
অনলাইনে ভিডিও ও অন্যান্য ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুগলের ভূমিকা রয়েছে। ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষ বিনোদনের পাশাপাশি বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। রান্না, ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তি, কারিগরি কাজ কিংবা সৃজনশীল বিভিন্ন বিষয় শেখার জন্য অনলাইন ভিডিও বর্তমানে অনেকের কাছে সহজলভ্য একটি মাধ্যম।
গুগল ব্যবহারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলোর একটি হলো অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্যের কাছে পৌঁছানো। আগে কোনো বিষয়ে তথ্য জানতে বই, সংবাদপত্র বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট উৎসের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতো। বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে একাধিক উৎস থেকে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। এর পাশাপাশি যোগাযোগ, তথ্য সংরক্ষণ, অনলাইন শিক্ষা, ব্যবসায়িক প্রচার এবং ভ্রমণের মতো অনেক কাজও সহজ হয়েছে।
তবে প্রযুক্তির এই সুবিধার পাশাপাশি কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। ইন্টারনেটে ভুল, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকতে পারে। ফলে যাচাই ছাড়া কোনো সার্চ ফলাফলকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, আইন, অর্থনীতি বা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়ে তথ্য ব্যবহারের আগে নির্ভরযোগ্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অনলাইন গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের সময় ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার। অপরিচিত ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া, সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশ করা কিংবা নিরাপত্তাহীন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করলে ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতাও একটি বিষয় হয়ে উঠছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে পড়াশোনা, কাজ, ঘুম ও পারিবারিক যোগাযোগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আবার কোনো বিষয় নিজে চিন্তা বা বিশ্লেষণ না করে সবসময় অনলাইন সার্চের ওপর নির্ভর করলে নিজের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও গবেষণার অভ্যাসও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই গুগলকে শুধু তথ্য পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে তথ্য যাচাই ও বিশ্লেষণের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। একটি তথ্য একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা প্রতিষ্ঠানের তথ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রেও নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। অভিভাবক ও শিক্ষকদের উচিত তাদের অনলাইন নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং তথ্য যাচাইয়ের বিষয়ে সচেতন করা। প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের পড়াশোনা, খেলাধুলা, সামাজিক যোগাযোগ ও পারিবারিক সময়ের মধ্যেও ভারসাম্য রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে গুগল আধুনিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত মাধ্যম হিসেবে মানুষের কাজকে দ্রুত ও সহজ করেছে। তথ্য অনুসন্ধান, শিক্ষা, যোগাযোগ, ব্যবসা, ভ্রমণ এবং বিনোদনের নানা ক্ষেত্রে এর ব্যবহার মানুষের সময় ও শ্রম সাশ্রয় করছে। তবে এর সুফল পেতে হলে প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে।
সঠিক তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গুগলকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে নিজের চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বজায় রেখে দায়িত্বশীলভাবে ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করাই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য।
MOHAMMAD MOINUDDIN