প্রকাশের তারিখ :১৩অক্টোবর ২০২৬
সিলেট প্রতিনিধি
সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সতর্কতা জোরদারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৫৮০ জনে পৌঁছেছে। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং আক্রান্তদের মধ্যে জটিলতার ঝুঁকি এড়াতে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে নতুন করে ১৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৬২ জন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যুর তথ্যও জানানো হয়েছে। তবে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং মশার বংশবিস্তার রোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি।
ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, পুরোনো টায়ার, পানির ট্যাংক এবং বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে পানি জমে থাকলে সেখানে মশার লার্ভা জন্মাতে পারে। এসব জায়গা নিয়মিত পরীক্ষা করে পানি অপসারণ করা এবং পানির পাত্র ঢেকে রাখার মাধ্যমে মশার বংশবিস্তার অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্যসচেতনতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করা। সাধারণত জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ নাও থাকতে পারে। জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো উচিত।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাবের মতো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সিলেট বিভাগের বর্তমান পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতে রোগীদের সেবা দেওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করাও প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পাড়া-মহল্লায় জমে থাকা পানি অপসারণ, নালা পরিষ্কার এবং নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, দিনের বেলায়ও প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা, শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা এবং দরজা-জানালায় মশা প্রবেশের সুযোগ কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ক্ষেত্রে জ্বর বা অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
সিলেট বিভাগের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আক্রান্তের সংখ্যা ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ঘাটতি থাকলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিভাগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫৮০ জন এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬২ জন উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যান পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা জানতে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগের আনুষ্ঠানিক হালনাগাদ তথ্য অনুসরণ করা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে, সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা, লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে রোগের বিস্তার ও জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ব্যক্তি, পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
JhuleKa Kanoon Juli