নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের তারিখ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬
ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অনলাইনে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) নিবন্ধন করেছেন অনেকেই। কিন্তু নিবন্ধনের পর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং প্রযোজ্য আইনি শর্ত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় তাঁদের একটি অংশ এখন অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। বিশেষ করে যাঁদের নিয়মিত আয় নেই কিংবা যাঁদের আয় করযোগ্য সীমার নিচে, তাঁদের মধ্যে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
টিআইএন নিবন্ধন করলেই কি প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন দিতে হবে? আয় না থাকলে রিটার্নে কী তথ্য উল্লেখ করতে হবে? নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে কী ধরনের আইনি জটিলতা হতে পারে? এসব প্রশ্নের সহজ ও নির্ভরযোগ্য উত্তর খুঁজছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
একজন টিআইএনধারীর অভিজ্ঞতা থেকে বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা যায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে অনলাইনে টিআইএন নিবন্ধন করার সময় পরবর্তী কর-সংক্রান্ত দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত জানা ছিল না। বর্তমানে করযোগ্য আয় না থাকায় রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজনীয়তা এবং এ বিষয়ে করণীয় নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তাঁর মতো পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য সহজ ভাষায় সরকারি নির্দেশনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে টিআইএন প্রয়োজন হতে পারে। ফলে অনেকে নির্দিষ্ট একটি কাজ সম্পন্ন করার জন্য নিবন্ধন করলেও পরবর্তী সময়ে করদাতা হিসেবে তাঁদের কী দায়িত্ব রয়েছে, তা খতিয়ে দেখেন না। পরে রিটার্ন জমার সময় ঘনিয়ে এলে কিংবা করসংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়লে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে টিআইএন থাকা, আয়কর পরিশোধ করা এবং আয়কর রিটার্ন দাখিল করা—এই তিনটি বিষয় এক নয়। কোনো ব্যক্তির আয় না থাকলে বা তাঁর আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলে তাঁর করের পরিমাণ শূন্য হতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। আবার শুধু টিআইএন রয়েছে বলেই প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো উচিত নয়।
এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির আয়ের অবস্থা, টিআইএন নেওয়ার কারণ, প্রযোজ্য আইন এবং সংশ্লিষ্ট করবর্ষের বিধান বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই নিজের পরিস্থিতি যাচাই না করে অন্য কারও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থী, অনিয়মিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি কিংবা বর্তমানে কোনো উপার্জন নেই এমন নাগরিকদের জন্য বিষয়টি বুঝতে সহায়তা প্রয়োজন। তাঁদের অনেকেরই প্রশ্ন, আয় না থাকলে রিটার্নে কীভাবে আর্থিক অবস্থার তথ্য তুলে ধরতে হবে এবং কোন নথি সংরক্ষণ করা উচিত। এসব বিষয়ে সহজ উদাহরণসহ নির্দেশনা পাওয়া গেলে ভুল তথ্য দেওয়ার আশঙ্কা কমতে পারে।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা থাকলেও সবার পক্ষে ডিজিটাল প্রক্রিয়া সহজে অনুসরণ করা সম্ভব হয় না। নিবন্ধন, প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ, আয়ের বিবরণ দেওয়া এবং রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে অনভিজ্ঞ ব্যবহারকারীরা সমস্যায় পড়তে পারেন। বিশেষ করে আগে কখনো রিটার্ন জমা দেননি, এমন ব্যক্তিদের জন্য নির্দেশনামূলক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ।
রিটার্ন দাখিল না করার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়েও অনেকের মধ্যে ভীতি রয়েছে। তবে জরিমানা বা অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থার বিষয়টি ব্যক্তির পরিস্থিতি এবং প্রযোজ্য বিধানের আলোকে বিবেচনা করতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভর না করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সরকারি নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে টিআইএন নিবন্ধনের সময়ই পরবর্তী দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া যেতে পারে। কোন পরিস্থিতিতে রিটার্ন জমা দিতে হবে, নির্ধারিত সময়সীমা কী এবং আয় না থাকলে কীভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করতে হবে—এসব বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলে সাধারণ মানুষ আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
একই সঙ্গে যাঁরা টিআইএন নিবন্ধন করেছেন কিন্তু এখন আর এর প্রয়োজন অনুভব করছেন না, তাঁদের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজলভ্য করা প্রয়োজন। তবে নিবন্ধন বাতিল বা সংশ্লিষ্ট কোনো আবেদন করলেই পূর্ববর্তী সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর আইন অনুসরণ করতে হবে।
করব্যবস্থায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু নিয়ম নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; সেই নিয়ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ যদি তাঁদের অধিকার, দায়িত্ব ও করণীয় সহজে বুঝতে পারেন, তাহলে অনিচ্ছাকৃত ভুল কমবে এবং আইন মেনে চলার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে।
টিআইএনধারীদের প্রত্যাশা, করসংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও ব্যবহারবান্ধব নির্দেশনা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শসেবা নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে করযোগ্য আয় নেই এমন ব্যক্তিদের জন্য পৃথক নির্দেশিকা, অনলাইন ব্যবস্থায় ধাপে ধাপে সহায়তা এবং সহজবোধ্য তথ্য প্রকাশ করা হলে তাঁদের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমতে পারে।
MOHAMMAD MOINUDDIN